হার্ডিঞ্জ ব্রিজ : বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেলসেতু - SOPNOBD

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ : বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেলসেতু


কর্মব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা অবসর পেলেই ভ্রমণ পিপাসুরা বেড়িয়ে পড়েন দূর থেকে আরও দূরে। দেশের আনাচে-কানাচের সৌন্দর্য খুঁজে বেড়ানোই ভ্রমণপ্রেমীদের নেশা। নানান জেলার নানান বিখ্যাত স্থাপনা ও সৌন্দর্যমন্ডিত জায়গাগুলো তাই মুখর থাকে ভ্রমণ প্রেমীদের পাদচারণায়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যতা। বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য আর অসংখ্য দর্শনীয় স্থানে ভরপুর পাবনায় রয়েছে দারুণ দৃষ্টিনন্দন ও বিখ্যাত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। বিখ্যাত এই ব্রিজটি দেখতে তাই প্রতিদিন ভিড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী।

বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে, পাকশী রেল-স্টেশন সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীর এবং কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারার পদ্মার তীরের মধ্যবর্তী একটি রেলসেতু। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রেলসেতু হিসেবে পরিচিত।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজকে ঘিরে ঈশ্বরদীর পাকশী দেশের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। এটির নামকরণ করা হয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামে। ১৯১০ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতবর্ষের ভাইসরয় ছিলেন। দুই দশক পূর্বে প্রস্তাব করা হলেও এটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯১০ সালে আর শেষ হয় ১৯১২ সালে। ১৯১৫ সাল থেকে এই ব্রিজে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

অবিভক্ত ভারত সরকার আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সহজ করতে এই ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ লর্ড হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি উদ্বোধন করেন। ব্রিজটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা (৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ রুপি)। এই ব্রিজটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার পূর্ব অংশের সাথে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা।

ব্রিজটি অপূর্ব সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে নির্মাণ করাতে ব্রিটিশ ইন চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলস’কে তার সাফল্যের পুরস্কার স্বরূপ স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৫টি স্প্যানের এই ব্রিজের দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৯৪০ ফুট। ব্রিজ দিয়ে শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য পাশাপাশি দুটি ব্রডগেজ রেললাইন রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের নির্মিত এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের খ্যাতি নানান কারণেই অতুলনীয়। যদিও বর্তমানে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের চেয়েও লম্বা অনেক সেতু আছে, তবে কিছু কিছু কারণে এই ব্রিজটি তর্কাতীত বিখ্যাত। তার কারণ হচ্ছে এই ব্রিজের ভিত গভীরতম পানির সর্বনিম্ন সীমা থেকে ১৬০ ফুট বা ১৯২ এমএসএল মাটির নিচে। এর মধ্যে ১৫ নম্বর স্তম্ভের কুয়া স্থাপিত হয়েছে পানির নিম্নসীমা থেকে ১৫৯ দশমিক ৬০ ফুট নিচে এবং সর্বোচ্চ সীমা থেকে ১৯০ দশমিক ৬০ ফুট অর্থাৎ সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১৪০ ফুট নীচে। সে সময় পৃথিবীজুড়ে এই ধরনের ভিত্তির মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে গভীরতম।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে ও পদ্মার পাড়ে বিকেল বেলাটা খুবই মনোরম কাটবে আপনার । চাইলে নৌকা নিয়েও পদ্মায় ঘুরতে পারেন। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আশেপাশে ঘুরতে। ছুটির দিনে এবং যেকোনো উৎসবে ভ্রমণপ্রিয় মানুষরা এখানে ঘুরতে আসেন। এখানে এলে আপনি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লালন শাহ সেতুও দেখতে পাবেন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু আর পদ্মার দু’পাড়ের সবুজে ঘেরা মনোরম সৌন্দর্য এখানে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘিরে ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট। ব্রিজের নিচেও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান। লালন শাহ সেতু নির্মাণের আগে হার্ডিঞ্জ ব্রিজেরে একপাশে মানুষের হেঁটে পারাপারের ব্যবস্থা ছিল। এখন সেই পথটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাকশীর দিকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ওঠার সিঁড়ির কাছে ব্রিজটি সম্পর্কে তথ্য বিবরণী দেখতে পাবেন।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সকল জেলা ও শহর থেকে যমুনা সেতুর মাধ্যমে সড়কপথে সরাসরি পাবনা যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে যমুনা সেতু হয়ে পাবনা যেতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে। এরপর ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশন অথবা ঈশ্বরদী বাসস্ট্যান্ড হতে রিকশা, সিএনজি অথবা টেম্পু দিয়ে পাকশী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেতে পারবেন।

যেখানে থাকবেন :

পাবনা শহরে থাকার জন্য নানান মানের হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হোটেল প্রবাসী ইন্টার ন্যাশনাল, হোটেল পার্ক, হোটেল শিলটন, ছায়ানীড় হোটেল, প্রাইম গেস্ট হাউস, মিড নাইট মুন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, স্বাগতম হোটেল এন্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি।

0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post