সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারি বাড়িতে একদিন - SOPNOBD

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারি বাড়িতে একদিন


সূর্যদেবের দৃষ্টি মেলে তাকানোর আগেই অ্যালার্ম ডেকেই চলছে। অ্যালার্মের দোষ নেই আজ নতুন গন্তব্যে যাব। তাও দিনে দিনে ফিরে আসতে হবে। আগামীকাল অফিসে কাজ আছে, তাই ছুটি নেই বিধায় এই ব্যবস্থা। ঘড়ির অ্যালার্ম ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে পাঁচ মিনিট বিরতি নিয়ে আবার ডাকা শুরু করে। ঘড়ির ঘেন ঘেনের চোটে আমার নিদ্রা থেকে উঠতেই হল। ঘুম থেকে উঠে দেখি মা রান্নাঘরে কাজ করছে। আমি বললাম, এত সকালে রান্নার কী দরকার আছে? আমরা তো বাইরেই খেয়ে নিতে পারব। মা বলল তা কি হয়, সকাল বেলা না খেয়ে বের হলে কী করে সারা দিন পার করবি। আর রাস্তার ব্যাপার চাইলেই তো খেতে পারবি না।

অগত্যা সকালবেলা মার হাতের পরোটা আর ডিম ভাজি খেয়ে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। আমি আর মা বের হয়ে পড়লাম স্নিগ্ধ সকালে। ভোরের মিষ্টি হাওয়ার সঙ্গে দূষণবিহীন পরিবেশ। ঢাকা শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আমরা এসে পৌঁছলাম মহাখালী বাস টার্মিনালে। এখানকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই চিরচেনা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ।

রবীন্দ্র কাছারি
ঠিক সাতটায় শ্যামলী পরিবহনের বাস আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করল। আমরা আজ চলছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরের কাছারি বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর মধ্যে শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত সাত বছর এখানে জমিদারি দেখাশোনার কাজে আসতেন।

তার উল্লেখযোগ্য কিছু রচনাও এখানেই রচিত হয়েছে। তিনি যখন আসেন তখন এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করে। ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুর জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরিকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে তিনি শেষবারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত বাড়িটি বর্তমানে রবীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক দিন ধরে যাব যাব করেও যাওয়া আর হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সূর্যদেবের কৃপায় বের হতে পারলাম আমরা। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলছে আমাদের বাস। বাসে বেজে চলছে পুরনো দিনের বাংলা গান। চমৎকার পরিবেশ রবির আলোয় আলোকিত ভুবন। সবাই যে যার মতো ছুটছে গন্তব্য পানে।

রবীন্দ্র কাছারি
মাঝে মাঝে বেরসিক রাস্তার জন্য নড়েচড়ে বসতে হচ্ছিল। সময়ের গতি প্রবাহে প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে আমরা এসে পৌঁছলাম সিরাজগঞ্জ রোডে। আগের থেকে খোঁজ নিয়ে জেনে নিয়েছিলাম সিরাজগঞ্জ রোডে নেমে সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যেতে হবে কাছারিবাড়ি। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা পেলাম সিএনজির। দরদাম করে উঠে পড়লাম সিএনজিতে।

সিএনজি তার দুরন্ত গতিতে চলছে, হঠাৎ মনে হল পেটে তো কিছু দেয়ার প্রয়োজন সেই সকালে খেয়েছি। সিএনজি পাইলট মহোদয়কে বললাম, এখানকার সবচেয়ে ভালো হোটেলে নিয়ে যান। তিনি বললেন, সামনে শাহজাদপুর বিসিক বাসস্ট্যান্ড সেখানে সুইট ড্রিম নামের হোটেলটিতে খাবারের ভালো ব্যবস্থা আছে। যেই বলা সেই কাজ, আমরা নেমে পড়লাম সুইট ড্রিম হোটেলে। বেশ সুন্দর পরিবেশ হোটেলটিতে সাদা রুটি, হালুয়া, ভাজি দিয়ে আহার পর্বটা সেরে নিলাম। অসাধারণ স্বাদ, ভোজনপর্ব শেষ করে আমরা আমাদের গন্তব্যে ছুটে চললাম।

দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম কাছারি বাড়িতে। রাস্তার শেষ মাথায় উত্তর-দক্ষিণ দু-দিকে দুটি রাস্তা গেছে। উত্তর দিকের রাস্তায় ‘রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি’। আমাদের সিএনজি’র পাইলট মহোদয় বললেন কাছারিবাড়ির পেছন দিকের গেট এটি। বর্তমানে এটাকেই প্রধান গেট করা হয়েছে। গুরুদেবের আমলে এখানেই ছিল ছোট নদীটি, যার ঘাটে কবির বোট এসে থামত।

কাছারিবাড়ির গেটে দাঁড়ালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় বাগান। নানা রঙের ফুল। রবীন্দ্রনাথ এখানে ট্যাংক তৈরি করিয়েছিলেন বারো মাস পদ্ম রাখার জন্য। ট্যাংকটির চারদিকে সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বাঁধানো ছিল। এখন অবশ্য সেই কৃত্রিম হ্রদ-পদ্ম নেই। তবে বাগানের ফুল দেখে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। বাগানের পরই তার হলুদ রঙের দোতলা কুঠি। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম।

রবীন্দ্র কাছারি
প্রবেশেই গুরুদেবের ভাস্কর্য আমাদের স্বাগত জানাল। ছুটির দিন তাই আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন গুরুদেবের স্মৃতিধন্য কাছারি বাড়ি দেখতে। দোতলা বাড়ি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। মা বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন না। জমিদারি দেখাশোনার জন্য কুষ্টিয়া থেকে মাঝে মাঝে আসতেন এবং সাময়িকভাবে বসবাস করতেন। তিনি স্থায়ীভাবে বাস করতেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। সম্ভবত এ কারণেই কুষ্টিয়ার বাড়িটি কুঠিবাড়ি আর শাহজাদপুরের বাড়িটি কাছারি বাড়ি নামে পরিচিত।

এই অঞ্চলটি আগে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারি নিলামে উঠলে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র তেরো টাকা দশ আনায় এই জমিদারি কিনে নেন। জমিদারির সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িটিও ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়েছিল। কথা বলতে বলতে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।

কাছারিবাড়ির নিচের তিনটি ঘর এবং ওপরের চারটি ঘর রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিচের সব ঘরই আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। আমরা ধীর পদে এগিয়ে চললাম প্রথম ঘরে, যেখানটা রবীন্দ্রনাথের নিজের এবং তার পরিবারের ছবি দিয়ে সাজানো। এখানে তার শৈশব এবং কৈশোরের ছবিসহ যৌবনের অনেক আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। আমরা দ্বিতীয় ঘরটিতে দেখতে পেলাম রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বয়সের ছবি এবং হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার সাক্ষাতের ছবি দিয়ে সাজানো।

রবীন্দ্র কাছারি
উল্লেখযোগ্য ছবি হল : তার ব্যবহৃত বোট পদ্মা, মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, আমার শেষ বেলার ঘরখানি, পদ্মাসনে উপবিষ্ট রবীন্দ্রনাথ, বার্ধক্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি। তৃতীয় ঘরটি রবীন্দ্রনাথের আঁকা বিভিন্ন ছবি দিয়ে সাজানো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : বৃক্ষ রাজি, নৈসর্গিক দৃশ্য, উপবিষ্ট চিত্র, মুখ নিরীক্ষা, বিভিন্ন রকমের প্রতিকৃতি।

আমরা এরপর গেলাম দ্বিতীয় তলার দিকে। দ্বিতীয় তলায় প্রবেশের পর দেখতে পেলাম কবির ব্যবহৃত পালকি, চিঠি লেখার ডেক্স, কাঠের আলনা, পড়ার টেবিল, দেয়ালে কবির বিভিন্ন সময়ে তোলা আলোকচিত্র ও পাণ্ডুলিপি, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি। এর পরের ঘরে রয়েছে ড্রেসিং টেবিল, শ্বেতপাথরের গোলটেবিল, টেবিল বেসিন, কাঠের আলনা, দেবতার আসন, হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ার, কবির ব্যবহৃত কাঠের বড় টেবিল।

পরের ঘরে রয়েছে সোফা, হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ার, কাঠের গোল টেবিল ইত্যাদি। এর পরের ঘরে রয়েছে বিছানা, হাতলযুক্ত কাঠের কেদারা ইত্যাদি। এছাড়াও আরও আছে বিভিন্ন রকমের কেরোসিনের বাতি, মোমদানি, অর্গ্যান, চীনামাটির বাসনকোসন, দেয়ালঘড়ি, ব্রোঞ্জের তৈরি বালতি, রান্নার পাতিল, ঘটি আরও অনেক কিছু। আমাদের মতো অনেকেই এসেছে কবি গুরুর স্মৃতিধন্য এই কাছারিবাড়ি দেখতে।

দেখা পেলাম প্রবীণ মহরম আলীর সঙ্গে. তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি-সম্ভারের উল্লেখযোগ্য অংশ শাহজাদপুরে বসে রচিত হয়েছে। বৈষ্ণব কবিতা, দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয় যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, প্রত্যাখ্যান, লজ্জা, চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে, নদীমাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, স্মৃতি, বিলয়, প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, যাত্রী, তৃণ, মানস লোক, কাব্য, প্রার্থনা, ইছামতি নদী, আশিষ গ্রহণ, বিদায়, নব বিরহ, লজ্জিতা, বিদায়, হতভাগ্যের গান, কাল্পনিক, যাচনা, সংকোচ মানস, প্রতিভা ইত্যাদি কবিতা এখানে লিখিত।

রবীন্দ্র কাছারি
এছাড়াও, পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারা প্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি গলাপগুলো এখানে লিখেছেন। ছিন্নপত্রের ৩৮টি পত্র, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জন নাটক শাহজাদপুরে লেখা। শাহজাদপুরে চোখে দেখা বাস্তব চরিত্রগুলো তার সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যে, গোপাল সাহার মেয়ে সমাপ্তি গল্পের নায়িকা, হারান চক্রবর্তী ছুটি গল্পের ফটিক, তার কাছারির বাবুর্চি কলিমুদ্দি চিরকুমার সভার কলিমুদ্দি মিঞা, পোস্টমাস্টার মহেন্দ লাল বন্দ্যোপাধ্যায় পোস্টমাস্টার গল্পের নায়ক। দিনের সূর্য নিদ্রায় যাওয়ার আগেই আমরা ফিরে চললাম আমাদের নীড়ের পানে। তবে এক অন্যরকম সময় পার করলাম আমরা।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে সরাসরি আপনাকে যেতে হবে সিরাজগঞ্জ রোডে। যমুনা সেতু পার হয়ে একটু সামনে সিরাজগঞ্জ রোড। ঢাকার গাবতলী ও মহাখালী থেকে অনেক বাস সিরাজগঞ্জ রোডের উদ্দেশে ছাড়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : হানিফ, শ্যামলী, এস আর ট্রাভেলস, টি আর ট্রাভেলস, নাবিল, বাবলু ইত্যাদি বিভিন্ন বাস চলাচল করে এই রুটে। ভাড়া নন এসি ২৫০ টাকা। ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা।

রবীন্দ্র কাছারি
এছাড়াও সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার বাসে করেও আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে সিরাজগঞ্জ রোডে। সিরাজগঞ্জ রোড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে কাছারি বাড়ি আসতে হবে। সিএনজির ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা আর রিজার্ভে গেলে ২৫০ টাকা লাগবে। সিরাজগঞ্জ রোড থেকে যেতে লাগবে এক ঘণ্টা।

ট্রেনে আসতে চাইলে আপনাকে নামতে হবে উল্লাপাড়া স্টেশনে। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা, ঢাকা থেকে খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন ও চিত্রা, ঢাকা থেকে রাজশাহী রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর সিল্কসিটি ও ধূমকেতু ইত্যাদি ট্রেন উল্লাপাড়া স্টেশন হয়ে যায়। লালমনি এক্সপ্রেস নামের দুটো ট্রেন ছাড়ে কমলাপুর থেকে। লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেন শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০টা ২০ মিনিটে।

0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post